শেখ হাসিনার চোখে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা

মোনতাছির চৌধুরী মাহিয়ানঃ মহাকালের মহাবিষ্ময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘“কেউ যদি বীরাঙ্গনাদের পিতার নাম জিজ্ঞেস করে তবে বলে দিও তাদের পিতা শেখ মুজিবুর রহমান আর তাদের ঠিকানার পাশে লিখে দিও ধানমন্ডি ৩২ নম্বর।” এমনই মহান মনোভাবের ব্যক্তিত্ব ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নিজ জন্মভূমি ও জনগণকে তিনি ভালোবাসতেন গভীর মমত্ববোধ নিয়ে।
শেখ হাসিনার চোখে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা
শেখ হাসিনার চোখে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা

বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা। পিতা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ নেতা হলেও রেখে যান নাই কিছুই। উত্তরাধিকার সূত্রে শেখ হাসিনার ভাগ্যে জোটে নাই সুখ সাচ্ছন্দ্যের ছিটেফোঁটাও। বরং ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর কন্যা হওয়ায় যেন শেখ হাসিনা’র অপরাধ ছিলো। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান স্থাপত্য শিল্পী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হওয়া সত্বেও নিজ দেশে আসার অধিকারটুকু হারিয়েছিলেন শেখ হাসিনা।

তবে শেখ হাসিনার শরীরে বহমান বঙ্গবন্ধু আপোষহীন রক্ত; সেই সত্যের ই বারবার প্রমাণ দিয়েছেন।১৯৮১ সালে স্বৈরশাসকদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে দেশে ফিরেন। এরপর থেকেই স্বাধীন দেশের গহ্বর থেকে পরাধীনতা-স্বৈরতন্ত্রের শৃঙ্খল ভাঙতে পাড়ি দিয়েছেন সংগ্রামের দীর্ঘ পথ। বারংবার যমদূতের সাথে সাক্ষাৎ করে তিনি ঘুরে দাঁড়িয়েছেন ধ্বংসস্তুপ থেকে উড়ে আসা ফিনিক্স পাখির মতো।

বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ সরকার। বয়স আশি ছুঁই ছুঁই। ধীরে ধীরে উপনীত হচ্ছেন বার্ধক্যে। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো অবসরেও যাবেন রাজনীতির মাঠ থেকে। অবসরের পর শেখ হাসিনা ফিরে যেতে যান নিজ জন্মস্থানে। সাধারণ গ্রাম বাংলার মানুষের মাঝেই কাটাতে চান বাকি সময়। তবে অবসরের পূর্বেই একটি সমৃদ্ধশালী,অনিন্দ্য সুন্দর উন্নত বাংলাদেশ গড়ে যেতে চান। পিতার অসম্পূর্ণ কাজকে সম্পূর্ণ করার অদম্য ইচ্ছা নিয়েই তাই কাজ করছেন অবিচল চিত্তে।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় লাভ করে সরকার গঠন করে। সরকার গঠনের পরবর্তী সময়েই ইশতেহার অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্য শুরু করে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করার উদ্যোগ নেন। তারই লক্ষ্যে ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়। এই ট্রাইবুনাল এখন পর্যন্ত রায় দিয়েছে প্রায় শতাধিক যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে। যিনি তাচ্ছিল্যের সুরে বলতেন, ‘বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধী বলতে কিছু নাই।’ সেই সাকা চৌধুরীর মতো দাম্ভিক ব্যক্তিকেও একদিন আইনের দঁড়িতে ঝুলতে হবে- এটা কি বাংলাদেশ কখনো কল্পনা করেছিলো?? বাংলাদেশ কি কখনো ভেবেছিলো- নিজামী, মুজাহিদ, কাদের মোল্লাকেও এভাবেই  বিচারের মুখোমুখি হতে হবে??

একসময় “খাম্বা তারেক” নামটি মানুষের মুখে মুখে ছিলো। বৈদ্যুতিক খুঁটি লাগিয়ে বিনা বিদ্যুৎ সরবরাহে কিভাবে দেশের মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ লুট করা হয়েছিল তা নজিরবিহীন ইতিহাস হয়ে থাকবে। সেই দূর্নাম গুছলো শেখ হাসিনার হাত ধরে। বাংলাদেশ এখন বিদ্যুৎ খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ঘন্টার পর ঘন্টা আঁধারে ডুবে থাকার দেশে লোডশেডিং ডাইনোসরের মতো বিলুপ্ত প্রায়। বর্তমানে বাংলাদেশ ২০ হাজার মেগাওয়াট এর চেয়েও বেশী বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার দেশ।

এক সময় বছর শেষে পরিচিত,আত্মীয় স্বজন থেকে বই সংগ্রহের হিড়িক পড়ে যেতো। এখন আর সেই জঞ্জাল নেই। মাধ্যমিক লেভেল পর্যন্ত সরকার শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই সরবরাহ করছে; তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালনকালে ২৯৬ কোটি পাঠ্যবই বিনামূল্যে বিতরণ করেছে বর্তমান সরকার। ২০০৮ সালের আগে যা কেউ কল্পনা করে নাই। দেশের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিতে বর্তমান সরকার নিয়মিত ছাত্রবৃত্তি, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, মাতৃকালীন সহ নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা  প্রদান করছে। বর্তমান সরকারের আমলে দারিদ্রের হার কমে দাঁড়িয়েছে ২১.৮ শতাংশে।

শিক্ষার মানোন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে সরকার। সরকারি স্কুল কলেজের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের বেতন ভাতা রেকর্ড মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে বর্তমান সরকারের আমলে। নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে মাতৃকালীন ছুটি ছয় মাসে উত্তীর্ণ হয়েছে। ইতিমধ্যে পিতৃকালীন ছুটির ব্যবস্থাও করেছে সরকার।  নতুন  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা যাতে আত্মনির্ভরশীল ও স্বাবলম্বী হয় তারই লক্ষ্যে কারিগরি শিক্ষার উপর জোর দিচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকার।

দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে সরকার গড়ে তুলেছে ডিজিটাল সেন্টার। সারাদেশে নির্মাণ করা হয়েছে ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র। এসব কমিউনিটি ক্লিনিকে ৩০ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে বিনামূল্যে।

বাংলাদেশের সম্পদ ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধিতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে বর্তমান সরকার। এক সময় জাটকা নিধন স্বাভাবিক ব্যাপার হলেও বর্তমান সরকারের আমলেই এটিকে কঠোরভাবে রোধ করা হয়েছে। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় মৎস্য আহরণ বন্ধ রাখতে হয় জেলেদের। সে সময়কালে জেলেদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরীতেও কাজ করছে সরকার। ফলশ্রুতিতে গত দশ বছরে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৭৫ শতাংশ।

লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণে কাজ করছে বর্তমান সরকার। ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের তথ্যানুযায়ী লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে বাংলাদেশ। নারী নিপীড়ন  বন্ধে আইন সংশোধনের মাধ্যমে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ। নারী পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিতকরণ ও নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করছে আওয়ামী লীগ সরকার।

নাগরিক সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের অন্যতম সফলতা “থ্রিপল নাইন” হেল্পলাইন। শুধুমাত্র কাগজি সেবা নয় বরং জনগণের যেকোন সমস্যায় তাৎক্ষণিক এগিয়ে আসা একটি  সেবা মাধ্যম এটি।

কৃষকের জীবনমান উন্নয়নে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। তারই প্রেক্ষিতে কৃষকদের প্রদান করা হচ্ছে কৃষিকার্ড। ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতে সরকার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ক্রয় করছে খাদ্যশস্য। এছাড়াও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষকদের সরবরাহ করা হচ্ছে উন্নতমানের বীজ, সার, কীটনাশক, আধুনিক যন্ত্রপাতি, কৃষি বিষয়ক শিক্ষা সহ নানান সুযোগ-সুবিধা।

মানবসম্পদ উন্নয়নে ভূমিকা পালন করছে বর্তমান সরকার। দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে দেশের রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে সফলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে পূর্বের তুলনায়। পোশাক শিল্পে বাংলাদেশের সফলতা রয়েছে। তাই গার্মেন্টস শিল্পের সাথে জড়িত শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন ভাতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করেছে সরকার।

অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ একটি ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মানে নিরলস পরিশ্রম করে বর্তমান সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো। সমুদ্রের তলদেশে নির্মাণ করা হচ্ছে অপটিকাল ফাইভার। সহজলভ্য ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিতে চলমান আছে ধারাবাহিক কার্যক্রম। মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করা হয়েছে। দেশকে বিস্তৃত ফোরজি নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পর এখন কাজ করছে ফাইভ জি নেটওয়ার্ক নিয়ে। মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে গেছে অত্যন্ত সুলভ মূল্যের এন্ড্রয়েড মোবাইল। দূর্নীতি ও দালাল চক্রের হয়রানির হাত থেকে রক্ষা করতে ভূমি মন্ত্রণালয় সহ সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সেবাদান কার্যক্রমকে অনলাইনের আওতাভুক্ত করা হচ্ছে। দেশে বিদ্যমান সকল সুযোগ সুবিধাকে একসাথে নিয়ে নিয়ে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ৩৫৫ একর এলাকাজুড়ে  নির্মিত হয়েছে হাইটেক পার্ক। এই অত্যাধুনিক সিটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান  ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে সরকার। এছাড়াও দেশের দ্বিতীয় হাইটেক পার্ক নির্মাণ করা হচ্ছে সিলেটের কোম্পানিগঞ্জে। এসব পার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে স্থানীয় তথা বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে।

বাংলাদেশে বর্তমান সরকারের নেতৃত্ব শুরু হয়েছে শিল্প বিপ্লব। তারই আওতায় সরকারী উদ্যোগে নির্মিত হচ্ছে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল। এসব ইকোনোমিক জোন নির্মিত হলে দেশের বেকারত্বের হার অনেকাংশে কমে আসবে বলে বিশ্বাস সংশ্লিষ্টদের। সমৃদ্ধ হবে বাংলাদেশের অর্থনীতি। স্থানীয় উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে অর্থনৈতিক জোনগুলো।

বাংলাদেশের ব্যাপক হারে অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। রাস্তাঘাট প্রশস্ত করণে সরকার কাজ করছে। মহাসড়কগুলো উন্নীত হচ্ছে চার থেকে ছয় লেইনে।রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে নির্মিত হয়েছে উড়াল সেতু। মেট্রোরেলের যুগে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত হচ্ছে টানেল। দেশের বিভিন্ন স্থানে তৈরী করা হচ্ছে এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালন করছে বাংলাদেশ। নানা উৎসব উৎযাপনে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালনের পরিকল্পনা থাকলেও করোনা সংকটকালে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সকল অনুষ্ঠান স্থগিত করে সরকার। তবে মুজিব বর্ষকে সামনে রেখে নানা ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। এরই প্রেক্ষিতে “আশ্রয়ন প্রকল্প-২” এর আওতায় সরকার গৃহহীনদের জন্য বাড়ি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে সরকার প্রায় নয় লক্ষ ভূমি ও গৃহহীন পরিবারকে শেখ হাসিনার উপহার হিসেবে বাড়ি নির্মাণ করে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় লক্ষাধিক পরিবারকে তাদের জন্য নির্মিত বাড়ি প্রদান করা হয়েছে।

এতোকিছুর পরও আমরা বলতে পারি না বাংলাদেশ সর্বক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই দেশে এমন আরো অনেক কিছুই আছে যার গুণগত পরিবর্তন প্রয়োজন। তবে এ কথা সবারই স্বীকার করতে হবে- একটি উন্নত রাষ্ট্র বিনির্মানে একাগ্রচিত্তে কাজ করছেন জনগণের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি আধুনিক, সমৃদ্ধশালী, বৈষম্যমুক্ত উন্নত রাষ্ট্রে উপনীত করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েই কাজ করছে শেখ হাসিনা’র নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। তাই বলা যায় শেখ হাসিনার হাত ধরেই বাংলাদেশ একদিন রূপান্তরিত হবে বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্নের সোনার বাংলায়। 

বে অব বেঙ্গল নিউজ / bay of bengal news

বে অব বেঙ্গল নিউজ - Bay of Bengal News

বে অব বেঙ্গল নিউজ