চট্টগ্রামে নারীর অভিনব প্রতারণা’র ফাঁদ

চট্টগ্রামঃ চট্টগ্রামে নুসরাত জাহান নামের এক নারীর বিরুদ্ধে উঠছে একের পর এক প্রতারণার অভিযোগ। তবু চট্টগ্রাম জুড়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে সে। চট্টগ্রামে এই নারীর ফাঁদে আটকে গেছে অনেকে।অজ্ঞাত আশ্রয় দাতার কারণে সে দাপটের সাথে তার কুকীর্তি চালিয়ে যাচ্ছে ।
চট্টগ্রামে নারীর অভিনব প্রতারণা'র ফাঁদ
চট্টগ্রামে নারীর অভিনব প্রতারণা’র ফাঁদ

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নুসরাত জাহান নিজেকে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার রওজারহাট এলাকার শিল্পপতি সামশুল হকের মেয়ে পরিচয় দিলেও প্রকৃতপক্ষে নগরের সিঅ্যান্ডবি এলাকার এক নারী তাকে লালন পালন করেছেন। ওই নারীর পৈতৃক বাড়ি হাটহাজারী উপজেলার আমানবাজার এলাকায়।

এদিকে প্রতারণার অভিযোগে নুসরাতের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা রুজু হয়েছে।মামলার এজাহারে বলা হয়, ভাটিয়ারি শিপ ইয়ার্ড নামে কথিত একটি জাহাজ ভাঙা প্রতিষ্ঠান বিক্রির কথা বলে বিভিন্ন সময়ে শাহ আলমের কাছ থেকে নগদে ৮ কোটি টাকা নেন নুসরাত। সময় মত কথিত ‘শিপ ইয়ার্ড’ রেজিস্ট্রি তো দূরের কথা টাকা ফেরত না দিয়ে নানা টালবাহানা করতে থাকেন নুসরাত।

এক পর্যায়ে শাহ আলমকে ৫ কোটি ও ৩ কোটি টাকার ২টি পৃথক চেক প্রদান করেন। কিন্তু চেকগুলো বারবার সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে ডিজঅনার হতে থাকে। উপায় না দেখে নুসরাতকে চাপ প্রয়োগ করলে তিনি গত ২ সেপ্টেম্বর টাকা পরিশোধ করা হবে মর্মে শাহ আলমকে অঙ্গিকারনামা দেন নুসরাত।

বাদি পক্ষের আইনজীবী জুলফিকার হায়দার ফয়সাল জানিয়েছেন, ‘প্রতারণার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলা দুটি ট্রায়ালের জন্য গত ১০ ফেব্রুয়ারি এবং গত ২১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মহারগর আদালতে স্থানান্তর করা হয়েছে। নুসরাত অনেক বড় মাপের একজন প্রতারক। শাহ আলম ছাড়াও নুসরাতের বিরুদ্ধে আরও অনেক ভুক্তভোগী প্রতারণার অভিযোগ করেছেন।’

এদিকে চেক প্রতারণার মামলা দায়েরের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর শাহ আলমের মতো নুসরাতের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ দায়ের করেন একাধিক ভুক্তভোগী। চিটাগাং শপিং কমপ্লেক্স এর কাপড় ব্যবসায়ী মো. রাসেল, নারী উদ্যোক্তা মুন্নী, শাহরিয়ার কবির সুমনসহ একাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, নুসরাত জাহান ওরফে নুসরাত ইকবাল ওরফে বাবলী আক্তার কখনো পরিচয় দেন শিল্পপতির মেয়ে, কখনো পরিচয় দেন শিপ ইয়ার্ড মালিক। বাস্তবে তিনি একজন প্রতারক।

প্রতারণার শিকার হওয়া শাহ আলম বলেন, ‘নুসরাত নিজেকে রাঙ্গুনিয়ার এক শিল্পপতির মেয়ে ও শিপ ইয়ার্ড ব্যবসায়ী পরিচয় দিলেও টাকা লেনদেনের পর তার (নুসরাত) আসল পরিচয় জানতে পারি। ৮ কোটি টাকার চেকের মামলা প্রশ্নবিদ্ধ করতে উল্টো আমার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করে হয়রানি করছেন।’

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন লোকজনের সাথে প্রতারণা করে আসছেন নুসরাত। তার প্রতারণামূলক কর্মকান্ডে ব্যবহার করে বিভিন্ন পর্যায়ের প্রভাবশালী লোকজনকে। এছাড়া একটি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, এস এম নুসরাত ইকবাল নামে শাহরিয়ার কবির সুমনকে পূবালী ব্যাংক লিমিটেড, মদুনা ঘাট শাখার হিসাব থেকে ৫ লাখ টাকার চেক, একই নামে কাপড় ব্যবসায়ী মো. রাসেলকে দেন ব্যাংক এশিয়া লিমিটেড, বহদ্দার হাট শাখার হিসাব থেকে ৯ লাখ টাকার চেক, মো. জিয়াউল নামে একজনকে ইউসিবি ব্যাংক লিমিটেড, মদুনা ঘাট শাখার হিসাব থেকে ২০ লাখ টাকার চেক এবং ব্যাংক এশিয়া লিমিটেড, মদুনা ঘাট শাখার হিসাব থেকে ৬ লাখ টাকার চেক। এছাড়াও মোরশেদ নামে এক ব্যক্তিকে দেন ইউসিবি ব্যাংক লিমিটেড এর ৫১ হাজার টাকার চেক এবং ডাচ বাংলা ব্যাংক লিমিটেড এর বাবলী আকতার নামের হিসাব থেকে ৫২ হাজার টাকার চেক এবং কাউসার পারভীন মুন্নী নামে এক নারী উদ্যোক্তাকে দেন ইউসিবি ব্যাংক লিমিটেড, মদুনা ঘাট শাখার হিসাব থেকে ২ লাখ টাকার চেক।

ভুক্তভোগী মুন্নীর অভিযোগ, ‘নুসরাত ভয়ংকর এক প্রতারক। সে কখনো নিজেকে পরিচয় দেন পুলিশের স্ত্রী। কখনো পরিচয় দেন শিল্পপতির মেয়ে, কখনো পরিচয় দেয় বড় ব্যবসায়ী। তার কাছে টাকা পাবে না এমন কোনো লোক নেই। নুসরাত থাকে চান্দগাঁও আবাসিক বি -ব্লকের বি-১২ নম্বর বাড়ির দ্বিতীয় তলার ২০২ নম্বর ফ্ল্যাটে। ওই ভবনের মালিক জনৈক হাবীবুর রহমান। এ বাড়ির মলিকও তার কাছে ভাড়া বাবদ পাবেন প্রায় আড়াই লাখ টাকা। এ প্রতারক নারীর অভ্যাস সহজ-সরল মানুষকে ফাঁদে ফেলে লাখ টাকা থেকে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া। টাকা দাবি করলে হুট করে চেক লিখে দেয়। পাওনা টাকার জন্য বাসায় গেলে ঢুকতে দেয় না। মামলার ভয় দেখায়।’

উল্লেখ্য নুসরাতের স্বামীর নাম ইকবাল । ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে তিনি এখন পঙ্গু ও অন্ধ। চান্দগাঁও আবাসিকের ওই ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে থাকেন স্বামী। তবে কয়েকমাস আগে ইকবলের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় নুসরাতের। তাদের সংসারে এক মেয়ে এক ছেলে আছে। এক সময় প্রাইভেট কার নিয়ে নগরে ঘুরে বেড়াতেন তিনি। ওই কারের চালকের নাম জলিল। সেও গাড়ি ভাড়া বাবদ তার কাছে দুই লাখ ৭০ হাজার টাকা পায়। এ নিয়ে নুসরাতের বিরুদ্ধে কোতোয়ালী থানায় একটি অভিযোগও দিয়েছেন। এ নারী মোবাইল ফোনের যত সিম ব্যবহার করেন সবগুলো জসিম উদ্দিন নামের এক ব্যক্তির। নুসরাত যে ফ্ল্যাটে ভাড়ায় থাকে ওই ভবনে দারোয়ানির কাজ করেন জসিম। তিনি (জসিম) নুসরাতের অপরাধের সব আমল নামা জানেন ও সহযোগিতা করে থাকেন বলে অভিযোগ আছে।

BAY OF BENGAL NEWS / বে অব বেঙ্গল নিউজ