“সিআরবি রক্ষায় চট্টগ্রামবাসী ঐক্যবদ্ধ থাকুন” – অ্যাডভোকেট মোঃ শফিউল আজম

অবশিষ্ট ছিল সিআরবি এলাকা। নব্য লুটেরা আর নব্য লর্ড ক্লাইভদের লোলুপ দৃষ্টি পড়েছে এবার সেই সিআরবিতে। “সিআরবি রক্ষায় চট্টগ্রামবাসী ঐক্যবদ্ধ থাকুন” – অ্যাডভোকেট মোঃ শফিউল আজম
"সিআরবি রক্ষায় চট্টগ্রামবাসী ঐক্যবদ্ধ থাকুন" - অ্যাডভোকেট মোঃ শফিউল আজম

চট্টগ্রামের ক্রীড়া সংস্কৃতি বিনোদনের স্থানগুলো ধীরে ধীরে সব আমরা হারাতে বসেছি। ঐতিহাসিক লালদীঘির পাড় মাঠ এগুলো নামে আছে বাস্তবে দিঘীও নেই পাড় বা মাঠও নেই। বিজয় উদ্যান বানিজ্য উদ্যানে পরিণত হয়েছে, ভাটিয়ারীর পাহাড় অরন্য সর্বসাধারনের নয়, হাটহাজারীর পুরাতন বিমান বন্দর, কৃষি ফার্ম আমাদের নেই, বলুয়ার দিঘী, ডেবার পাড়ের ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে, মগরাজাদের রাজধানী ঐতিহাসিক দেয়াং পাহাড়, কাফকো, সিএফএলে আমরা জনগণের প্রবেশাধিকার নেই, বর্ষবরণের পাদভুমি ডিসি হিল থেকে আমরা বিতাড়িত, ফয়’সলেক জুয়াড়িদের দখলে, বিজয় মেলার স্থান সার্কিট হাউজ চত্বর, আউটার স্টেডিয়াম সব আমাদের থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছে।

বলা হয় এক সাগর রক্ত আর ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশের প্রকৃত মালিক জনগণ। দেশের নামও রাখা হয়েছিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। জনগণের এই দেশে নব্য কাবুলিওয়ালা আছে, লর্ড ক্লাইভ আছে, মীর জাফর জগৎশেঠ রাজবল্লভরা আছে, মাড়োয়ারী আছে দালাল ফড়িয়া, লুটেরা আমলা, দেশদ্রোহী রাজাকার, রাজপুটিন রাজনীতিক, পাচারকারী কালোবাজারী সব আছে অথচ দেশের কোথাও কোন ক্ষেত্রে জনগণ নেই, জনগণ থাকলেও গণ-প্রজার রাষ্ট্রে গণ-প্রজার মালিকানা স্বত্বকে স্বীকার করা হয়না। নামে গণ-প্রজাতন্ত্র কাজে কর্মে সর্বত্রই আমলাতন্ত্র।

জনগণের সংস্কৃতি রক্ষা ও চর্চাকে গুরুত্ব দিয়ে দেশের পবিত্র সংবিধানের ২য় ভাগের ২৩ ধারায় বলা হয়েছে- “রাষ্ট্র জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন এবং জাতীয় ভাষা,সাহিত্য ও শিল্পকলাসমুহের এমন পরিপোষণ ও উন্নয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন যাহাতে সর্বস্তরের জনগণ জাতীয় সংস্কৃতির সমৃদ্ধিতে অবদান রাখিবার ও অংশগ্রহণ করিবার সুযোগ লাভ করিতে পারেন।”

–কিন্তু বাস্তবে চট্টগ্রামের জনগণের জন্য সে সুযোগ কোথাও রাখা হয়েছে কি? আমাদের নামমাত্র থিয়েটার ইনস্টিটিউট,শিল্পকলা একেডেমীর ধারণ ক্ষমতা কত? সংবিধানের একই ভাগের ২৪ ধারায় বলা হয়েছে– “বিশেষ শৈল্পিক কিংবা ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন বা তাৎপর্যমন্ডিত স্মৃতিনিদর্শন,বস্তু বা স্থানসমুহকে বিকৃতি বা অপসারণ হইতে রক্ষা করিবার জন্য রাষ্ট্র ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।”

সিআরবি চট্টগ্রাম শহরের মাঝখানে প্রাকৃতিকভাবে একটি নাতিশীতোষ্ণ স্থান,অক্সিজেন ভান্ডার, ইট পাথরের বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ফুসফুস।সিআরবি শুধু চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক স্থান নয়, এটি আমাদের অত্যন্ত জনগুরুত্ব সম্পন্ন স্থান,যেখানে রয়েছে ঐতিহাসিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমাহার, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন এবং জাতীয় গৌরবমন্ডিত স্থান। হাজার বছরের পাহাড়ী টিলার সমাহার,শত শত বছর পূর্বের শিরিষ গাছ, ১৮৯৫ সালে বৃটিশ সরকার নির্মিত পূর্ব ভারতের দৃষ্টি নন্দন ভিক্টোরিয়ান স্থাপনা সেন্ট্রাল রেল ভবন, ক্লাব, খাল নালা আঁকাবাকা সর্পিল পথ, শহীদ বীর আব্দুর রবের সমাধি,শহীদ কলোনী, শহীদ রব সড়ক।

শীত গ্রীষ্ম বর্ষা সারা বছর এখানে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের আনাগোনা-উঠাবসা, আড্ডা-বিশ্রাম, বর্ষবরণ, সংস্কৃতির চর্চা হয়। এটা আমাদের একমাত্র বিনোদন স্পট ও অবসর যাপনের প্রিয় স্থান। এ স্থানের ঐতিহ্য রক্ষা করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং এ স্থানকে রক্ষা করা চট্টগ্রামের জনগণের ঈমানী দায়িত্ব।চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে এটি সংরক্ষিত স্থান এবং তা একমাত্র সর্বসাধারনের বিনোদনের জন্য।

দেশের জগৎশেঠ রাজবল্লভরা টাকার জোরে রাষ্ট্রের রক্ষকদের ভক্ষক বানিয়ে চট্টগ্রামের সিআরবিকে দখল
করে তাদের স্বজাতিদের জন্য “বিশেষায়িত”(!) হাসপাতাল কলেজ নার্সিং ইনস্টিটিউট বানাতে চায় বানাক, কিন্তু সিআরবিতে কেন?

আমরা চট্টগ্রামবাসী এটা কোনমতেই হতে দেবনা, কোনমতেই না। যারা বলতেছে সিআরবির গোয়াল পাড়ায় হলে সিআরবির সৌন্দর্যহানি হবেনা। আমরা বলতে চাই গোয়ালপাড়া বুঝিনা,সিআরবির ত্রি-সীমানায় জনগণের বিনোদনধর্মী স্থাপনা ছাড়া কোন ধরনের স্থাপনা চট্টগ্রামবাসী হতে দেবেনা দেবেনা। বিশেষ লোকদের জন্য বিশেষায়িত কিছু করতে হলে চট্টগ্রামে আরো অনেক স্থান আছে সেখানে করুক আমাদের কোন আপত্তি নেই,কিন্তু সিআরবিতে নয়।

চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের প্রতি সম্মান দেখিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং চট্টগ্রামের নেতৃবৃন্দসহ সবাই ইতোমধ্যে কথা দিয়েছেন সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণ হবে না, কিন্তু রেলের ডিজি এবং জিএম যথাক্রমে ধীরেন্দ্রনাথ মজুমদার ও জাহাঙ্গীর হোসেন অত্যন্ত ধৃষ্টতাপুর্ণ বক্তব্য রেখেছেন যা আমরা কোনমতেই মেনে নিতে পারিনা।

ধীরেন্দ্রনাথ বলেছেন -যারা আন্দোলন করছে তারা বাইরের লোক চট্টগ্রামের নয়, বাইরের বলতে তিনি কি পশ্চিমবঙ্গের লোক বুঝিয়েছেন নাকি? আশাকরি জবাব দেবেন। তিনি আবার বলেছেন- সিআরবির মালিক চট্টগ্রামের জনগণ নাকি? সিআরবির মালিক চট্টগ্রামের মালিক চট্টগ্রামের জনগণ না হলে সিআরবি কি ধীরেন্দ্রনাথের বাপ দাদার তালুক নাকি?দেশটাইতো জনগণের, ধীরেন্দ্রনাথেরা যে জনগণের বেতনধারী গোলাম সে কথাকি তারা বারবার ভুলে যাবেন?

অন্যদিকে চট্টগ্রামের ফুসফুস খ্যাত রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সদর দফতর সংলগ্ন সিআরবি এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণ থেকে সরে আসার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক জিএম জাহাঙ্গীর হোসেন।

প্রকল্পের চুক্তি বাতিল চেয়ে সর্বশেষ ১০১ নাগরিকের দেওয়া বিবৃতির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে রবিবার ২৫ জুলাই রাতে তিনি একথা বলেছেন।সরে আসার সুযোগ নেই বলতে জাহাঙ্গীর সাহেব কি বোঝাতে চেয়েছেন চট্টগ্রামের জনগণকে? চট্টগ্রামের মানুষকি এতই কম বুঝেন? কারা নেতা কারা মীরজাফর চট্টগ্রামবাসী ভালভাবেই চিনে।তাদের উপর ভর করে যদি জাহাঙ্গীর সাহেবরা জনমতের বিরোদ্ধে অবস্থান নেবার চেষ্টা করে থাকে তাহলে তারা বোকার স্বর্গেই বাস করবেন।

চট্টগ্রামের মানুষ রাস্তায় নামলে জাহাঙ্গীর- -ধীরেন্দ্রনাথরা নয় শুধু কোন মীরজাফরেরই পেছনে সরে যাবার সুযোগ থাকবেনা। অতএব,এখনো সময় আছে সিআরবি ভাড়া দিয়ে টাকা কামানোর কিংবা রেলের ঘাটতি পূরনের সিদ্ধান্ত বাতিল করুন,রেলকে লাভজনক খাতে ফেরানোর দিকে নজর দিন,জনগণের রক্ত-ঘামের বিনিময়ে পরিশোধিত বেতন ভাতা হালাল করুন।সিআরবি জনগণের, সিআরবি চট্টগ্রামের মানুষের।সিআরবি নিয়ে ছিনিমিনি করার চিন্তা বাদ দিন।

লেখকঃ “সিআরবি রক্ষায় চট্টগ্রামবাসী ঐক্যবদ্ধ থাকুন” – অ্যাডভোকেট মোঃ শফিউল আজম

বে অব বেঙ্গল নিউজ / bay of bengal news