জাতীয় সংসদে সাংসদদের তোপের মুখে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কেনাকাটায় দুর্নীতির ডিপো। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেককে সুস্পষ্টভাবে জানাতে হবে, কীভাবে এই মন্ত্রণালয়ের সংস্কার করবেন বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ।
সংসদে সাংসদদের তোপের মুখে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক
সংসদে সাংসদদের তোপের মুখে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক

সোমবার (৭ জুন) ২০২০-২১ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মঞ্জুরি দাবি ও ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় সাংসদ হারুন জাতীয় সংসদে এসব কথা বলেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দৈনিক পত্রিকা “প্রথম আলোর” জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামকে নিগ্রহের ঘটনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বিরোধী দলের সদস্যদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। কিন্তু এ বিষয়ে অবশ্য মন্ত্রী জাহিদ মালেক কোনো বক্তব্য দেয়নি।

সাংসদ হারুনুর রশীদ বলেন, তিনি বেহাল হয়ে গেছেন স্বাস্থ্য খাত নিয়ে কথা বলতে বলতে। স্বাস্থ্য বিভাগকে সংস্কারের আওতায় আনার ও বেহাল দশা থেকে রক্ষায় কমিটি গঠনের কথা বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, জেলা উপজেলায় চিকিৎসক নেই কিন্তু ঢাকায় এক পদে ৫০ জন চিকিৎসক। ভারতে যাচ্ছে লাখ লাখ মানুষ চিকিৎসার জন্য। এতে চলে যাচ্ছে বিদেশে লাখো কোটি টাকা।

এই সাংসদ বলেন, করোনার টিকা কার্যক্রম কবে শুরু হবে, তা স্পষ্টভাবে বলতে হবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেককে। প্রয়োজনে উন্মুক্ত করে দিতে হবে টিকা আনা। কিন্তু সজাগ থাকতে হবে।

এদিকে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংরক্ষিত আসনের সাংসদ রওশন আরা মান্নান বলেন, আবজালরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে রূপকথার গল্পের মতো অনিয়ম করছে। যিদিও এখন কিছুটা কমেছে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে। কিন্তু থামানো যাচ্ছে না তাদের। এখানে অনেক আবজাল, মালেকের ছড়াছড়ি। একজন নারী উপসচিবের বাড়ি আছে কানাডাসহ তিনটি দেশে।

সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে হেনস্তার সমালোচনা করে সাংসদ রওশন আরা মান্নান প্রশ্ন রাখেন, একজন নারী সাংবাদিক অন্যায় করলে তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশে দেওয়া হল না কেন? কেন তাঁকে আটকে রেখে ছয় ঘণ্টা নির্যাতন করা হলো? কেন আইন তুলে নেওয়া হলো নিজের হাতে? নিজেরাই কেন তাঁকে অত্যাচার করল? এটা নিয়ে সমালোচনা করছে দেশবাসী।

এদিকে জাতীয় পার্টির সাংসদ কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, একজন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা যায় চুরি–ডাকাতি করলে। কিন্তু আইন কেন নিজের হাতে তুলে নেওয়া হলো—এমন প্রশ্ন রেখে সাংসদ বলেন, ‘তাঁকে আটকে রাখা হলো ছয় ঘণ্টা। তাঁকে টয়লেটে যেতে দেয়া হয়নি। অসুস্থ মানুষ, তা-ও মহিলা, তাঁকে হেনস্তা করা যায় এভাবে? এটা নিয়ে কথা বলল জাতিসংঘসহ সারা পৃথিবী। আমাদের ভাবমূর্তিটা কোথায় গেল? নিজেদের দুর্বলতা নিজেদের লুকাতে হয়।’

ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘আসলে লাভ কী কথা বলে। কে শুনে কার কথা। আর কেউ বিশ্বাসও করে না আমাদের কথা। এ জন্য কথা বলতেও চাই না।’

বিএনপির আরেক সাংসদ মোশাররফ হোসেন বলেন, উপসচিব পর্যায়ের একজন নারী কর্মকর্তা প্রথম আলোর সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের গলা চিপে ধরে নির্যাতন ও হেনস্তা করেছেন, হতে পারে না এটা।

কাজী ফিরোজ রশীদ জাহিদ মালেককে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আপনি একজন সজ্জন ব্যক্তি। আপনার বাবা মন্ত্রী ছিলেন আমার সঙ্গে। আপনাকে চিনি আমি। আপনি অত্যন্ত ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। কিন্তু আপনার তো কোন কর্তৃত্ব নেই মন্ত্রণালয়ে।’

সাংসদ কাজী ফিরোজ আরো বলেন, হাসপাতালে নেই অক্সিজেন। অক্সিজেন দরকার এখন। তা না এনে আনা হচ্ছে সিটিস্ক্যান মেশিন, এমআরআই। পাঠানো হচ্ছে উপজেলায়। আর তারা সাজিয়ে রেখে দিয়েছে সব। কারণ তারা এই মেশিন চালাতে পারে না। লাখো কোটি টাকা শুধু শুধু ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু সেবা পাচ্ছে না জনগণ।

বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ ব্যরিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, ‘মাশুল দিতে হচ্ছে স্বাস্থ্য খাতে অবহেলার। এই খাতে বরাদ্দ দেওয়া উচিত ছিল জিডিপির অন্তত পাঁচ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশে বরাদ্দ আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত করোনাকালে স্বাস্থ্য খাতে আগের বছরের তুলনায় একশত সাইত্রিশ শতাংশ বেশি বরাদ্দ দিয়েছে। বাংলাদেশে এই খাতে বরাদ্দ বেড়েছে মাত্র বার শতাংশ। বাড়ানো হয়নি বরাদ্দ করোনাকালেও। আবার যেটুকু বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, ব্যবহার হয়নি তাও।’

এই নারী সাংসদ আরও বলেন, ‘ স্বাস্থ্য খাতে ১০ মাসে এডিপির মাত্র পচিশ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। এখন আবার নতুন বরাদ্দ চাইছে। কেন ৭৫ শতাংশ বরাদ্দ অব্যবহৃত রয়ে গেছে, তার জবাব জাহিদ মালেককে দিতে হবে।’

রুমিন ফারহানা আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার জেলায় জেলায় আইসিইউ স্থাপন করতে বলেছেন। কিন্তু দেড় বছরে নতুন আইসিইউ স্থাপন করা হয়েছে মাত্র ৫টি জেলায়। এখনও আইসিইউ নেই ৪৫টি জেলায়।’

সাংসদ রুমিন বলেন, ‘আগে ব্যবসায়ী, এমপি-মন্ত্রীরা অনেকে ভাবতেন, সর্দি-কাঁশি হলেও দেশে চিকিৎসা নিতে হবে না। করোনা দেখিয়েছে উপায় নেই দেশের চিকিৎসা ছাড়া।’

সংসদ সদস্যদের সমালোচনার জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, স্বাস্থ্যসেবা হলো একটি ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। করোনা চলছে দেড় বছর যাবৎ। সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তারা।

করোনা মোকাবিলায় বর্তমান সরকারের নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ওষুধের কোনো ঘাটতি হয়নি। অক্সিজেনের অভাব এখন পর্যন্ত হয়নি। আমেরিকা ও দেশের বাইরে যে চিকিৎসা, একই চিকিৎসা এখানেও হয়েছে। টিকা কার্যক্রম বর্তমানে চলমান। এসকল উদ্যোগের কারণে মৃত্যুর হার এখন পর্যন্ত দেড় শতাংশ। পৃথিবীতে এই হার এখন পর্যন্ত আড়াই শতাংশ।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক আরও বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে করোনা বেড়ে যাওয়ায় সেরাম ইনস্টিটিউট চুক্তিকৃত টিকা সরবরাহ করতে পারছে না। এজন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে চীন-রাশিয়া-আমেরিকা থেকে। চুক্তিও হয়েছে ইতিমধ্যে। তিনি আরও বলেন, টিকা কিনতে হবে আরও অনেক। প্রতিটা ব্যক্তির ক্ষেত্রে লাগবে টিকার জন্য প্রায় তিন হাজার টাকা করে। করোনার সময়ও দেশে পনের হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে প্রতিটি ব্যক্তির জন্য সাধারণ শয্যায় চিকিৎসা নিতে। এটা সরকারই বহন করেছে। যারা করোনায় আইসিইউতে ছিল, তাদের জন্য ৫০ হাজার টাকা করে খরচ বহন করেছে সরকার।

করোনা মোকাবিলায় এ পর্যন্ত বাংলাদেশ খুবই সফলতা দেখিয়েছে বলে দাবি করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। এ কারণেই জীবনযাত্রা প্রায় স্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেন জাহিদ মালেক।

Bay of Bengal News / বে অব বেঙ্গল নিউজ